রমযান : আত্মশুদ্ধির মৌসুম এবং রোযার মহিমা, গুরুত্ব ও ফযিলত
- আপলোড সময় : ২০-০২-২০২৬ ০৯:৩৫:৫৪ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ২০-০২-২০২৬ ০৯:৩৫:৫৪ অপরাহ্ন
মুফতি হাম্মাদ আহমদ মুহাদ্দিসে গাজিনগরী::>
মানুষের জীবন বড়ই অস্থির। কখনো সুখের ঢেউ, কখনো দুঃখের ¯্রােত - কখনো নফসের উন্মত্ত তাড়না, আবার কখনো হৃদয়ের গভীর অতৃপ্তি। এই অস্থিরতার ভিড়ে মানুষ যেন নিজের আসল পরিচয় ভুলে যায়। সে ভুলে যায়, সে কেবল দেহ নয়, সে আত্মা; সে কেবল পৃথিবীর পথিক নয়, সে পরকালের যাত্রী। এই ভুলে যাওয়ার রোগ থেকে মানুষকে জাগিয়ে তুলতে আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন এক মহিমান্বিত মাস- রমযান। এ মাস যেন আত্মার বসন্ত, হৃদয়ের পরিশুদ্ধির জলধারা, ঈমানের নবজাগরণের সুবর্ণ দ্বার। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের এই মাসে মানুষের জন্য ফরজ করা হয়েছে এমন এক ইবাদত, যার তুলনা নেই আর সেটি হলো রোযা।
রোযা কেবল না খেয়ে থাকার নাম নয়। রোযা হলো নফসকে সংযত করার নাম, দৃষ্টিকে পবিত্র রাখার নাম, জিহ্বাকে সত্যে নিয়োজিত করার নাম, হৃদয়কে আল্লাহমুখী করার নাম। রোযা এমন এক ইবাদত, যা মানুষের ভেতর থেকে পশুত্বকে নিভিয়ে দিয়ে জাগিয়ে তোলে তাকওয়ার আলো।
আল্লাহ তাআলা বলেন- “তোমাদের ওপর রোযা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (সূরা বাকারা: ১৮৩)
এই আয়াত যেন রোযার উদ্দেশ্যকে এক বাক্যে স্পষ্ট করে দিয়েছে- তাকওয়া, অর্থাৎ আল্লাহভীতি,আত্মসংযম এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহকে সামনে রেখে চলা।
রোযা: এমন ইবাদত যার প্রতিদান আল্লাহ নিজেই দেন। ইবাদতের জগতে রোযার একটি অনন্য মর্যাদা রয়েছে। কারণ এটি এমন ইবাদত, যা মানুষের চোখের আড়ালে সংঘটিত হয়। কেউ জানে না আপনি প্রকৃত অর্থে রোযা রেখেছেন কি না - আপনার অন্তর ছাড়া আর কেউ তা উপলব্ধি করতে পারে না।
এই কারণেই হাদিসে এসেছে, আল্লাহ তাআলা বলেন- “রোযা আমার জন্য, আর আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।” (সহিহ বুখারি)
অর্থাৎ রোযার সওয়াবের পরিমাণ নির্ধারণের দায়িত্ব আল্লাহ নিজ হাতে রেখেছেন। এটি রোযার এমন এক সম্মান, যা অন্য কোনো আমলের ক্ষেত্রে এত ¯পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়নি।
রোযা: দুনিয়ার ক্ষুধা, আখিরাতের শান্তি :
রমযানে ক্ষুধা মানুষকে শেখায় কৃতজ্ঞতা। তৃষ্ণা মানুষকে শেখায় সহানুভূতি। দারিদ্র্যের ব্যথা মানুষকে শেখায় দানের মাহাত্ম্য। রোযা মানুষের অন্তরে একটি নতুন অনুভূতি জাগিয়ে তোলে - অভাবী মানুষের প্রতি দরদ, অসহায় মানুষের প্রতি মমতা।
এ কারণেই হাদিসে এসেছে- “যে ব্যক্তি রোযার কারণে তৃষ্ণার্ত থাকে, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন পানি পান করাবেন।” (মুসনাদে বাযযার)
কিয়ামতের দিন যখন সূর্য মানুষের মাথার নিকটে চলে আসবে, যখন তৃষ্ণা মানুষের গলা শুকিয়ে দেবে - সেদিন রোযাদারদের জন্য এই পানীয় হবে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ অনুগ্রহ।
রোযা: জান্নাতে প্রবেশের এক বিশেষ সিঁড়ি :
হযরত আবু উমামা (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলেছিলেন- “হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন, যার মাধ্যমে আমি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি।” তিনি বললেন- “তুমি রোযা রাখো, কেননা এর সমতুল্য কিছু নেই।” (মুসনাদে আহমদ)
এই কথাটি যেন একটি আকাশসম উচ্চ ঘোষণা- রোযা এমন ইবাদত, যার মতো আর কিছু নেই। কারণ এটি মানুষের প্রবৃত্তিকে ভেঙে দেয়, অহংকারকে গলিয়ে দেয়, আত্মাকে ন¤্র করে তোলে এবং বান্দাকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে।
রোযা: জাহান্নাম থেকে রক্ষাকারী ঢাল -
দুনিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে ঢাল যেমন মানুষের জীবন বাঁচায়, তেমনি আখিরাতের যুদ্ধক্ষেত্রে রোযা মানুষের ঈমানকে রক্ষা করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- “রোযা হলো ঢাল।” (সহিহ বুখারি)
যে ব্যক্তি রোযা রাখে, সে নিজের চোখকে হারাম থেকে, কানকে অসত্য থেকে, জিহ্বাকে গিবত ও মিথ্যা থেকে, হৃদয়কে হিংসা ও অহংকার থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে। ফলে রোযা তাকে গোনাহের আগুন থেকে নিরাপদ রাখে।
রোযা: কিয়ামতের দিন বান্দার সুপারিশকারী -
কিয়ামতের দিন মানুষ যখন ভীত, অসহায় ও নিঃস্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে - সেদিন মানুষের পাশে দাঁড়াবে তার আমল। কিন্তু সব আমলের মধ্যে রোযার সুপারিশের বিষয়টি এসেছে বিশেষভাবে।
হাদিসে বর্ণিত- “রোযা ও কুরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে।”
রোযা বলবে- “হে আমার রব! আমি তাকে দিনের বেলা খাবার ও প্রবৃত্তি থেকে বিরত রেখেছিলাম, অতএব আমার সুপারিশ কবুল করুন।” (মুসনাদে আহমদ)
কী অপার সৌভাগ্য! যে রোযা দুনিয়াতে বান্দাকে সংযম শিখিয়েছে, সেই রোযাই আখিরাতে হয়ে উঠবে বান্দার মুক্তির কণ্ঠস্বর।
রোযাদারের জন্য জান্নাতের বিশেষ দরজা - ‘রাইয়্যান’ জান্নাতে অনেক দরজা থাকবে। কিন্তু রোযাদারদের জন্য থাকবে একটি বিশেষ দরজা - যার নাম রাইয়্যান। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- “জান্নাতে একটি দরজা আছে যার নাম রাইয়্যান। কিয়ামতের দিন এই দরজা দিয়ে কেবল রোযাদাররাই প্রবেশ করবে।” (সহিহ বুখারি)
এ যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে রোযাদারদের জন্য বিশেষ সম্মানপত্র। যে দরজা দিয়ে তারা প্রবেশ করবে, সে দরজা দিয়ে অন্য কেউ প্রবেশ করবে না। রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের চেয়েও উত্তম মানুষের কাছে ক্ষুধার গন্ধ অস্বস্তিকর মনে হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর কাছে সেটি হয়ে যায় ইবাদতের সুবাস।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- “রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের ঘ্রাণের চেয়েও উত্তম।” (সহিহ বুখারি)
এখানে একটি গভীর শিক্ষা রয়েছে- আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সামান্য কষ্টও আল্লাহর কাছে কত মূল্যবান!
রোযা: অতীত গোনাহ মাফের সুবর্ণ সুযোগ-
রমযান যেন এক আধ্যাত্মিক দরবার, যেখানে বান্দা ফিরে আসে চোখের পানিতে, ফিরে আসে তওবার ভাষায়, ফিরে আসে পাপমুক্ত জীবনের প্রতিজ্ঞায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় রমযানের রোযা রাখবে, তার পূর্বের গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (সহিহ বুখারি)
এ হাদিস যেন আমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অপূর্ব আহ্বান- “ফিরে এসো, আমি ক্ষমা করতে প্রস্তুত।”
রোযাদারের জন্য রয়েছে দুই আনন্দ :
রোযাদার দুনিয়াতেও আনন্দ পায়, আখিরাতেও আনন্দ পায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- “রোযাদারের জন্য দুইটি আনন্দ রয়েছে - একটি ইফতারের সময়, আরেকটি তার রবের সাথে সাক্ষাতের সময়।” (সহিহ বুখারি)
ইফতারের আনন্দ শুধু খাবারের আনন্দ নয়; বরং এটি আল্লাহর নির্দেশ পালনের তৃপ্তি। আর আখিরাতের আনন্দ হলো সেই আনন্দ, যেখানে বান্দা আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ইবাদতের ফল দেখতে পাবে।
রোযাদার সিদ্দিকীন ও শহিদদের দলভুক্ত হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করে :
হাদিসে এসেছে- এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে এসে বলল, “আমি যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি, যাকাত দিই, রমযান মাসে রোযা রাখি এবং কিয়ামুল লাইল করি,তবে আমি কার দলভুক্ত হব?” তিনি বললেন- “তুমি সিদ্দিকীন ও শহিদদের দলভুক্ত হবে।” (মুসনাদে বাযযার)
এটি রোযার সর্বোচ্চ সম্মানগুলোর একটি। সিদ্দিকীন ও শহিদদের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হওয়া কোনো ছোট মর্যাদা নয়, এটি ঈমানের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক।
রমযান: নিজেকে গড়ার মাস রমযান আসলে আমাদের জীবনের একটি বার্ষিক আত্মসমালোচনার সময়। এই মাস আমাদের শেখায়- কীভাবে ক্ষুধাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, কীভাবে নফসকে দমন করতে হয়, কীভাবে আল্লাহর জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, কীভাবে দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত হয়ে আখিরাতের দিকে ফিরে যেতে হয়।
রমযান সেই মাস, যখন মানুষ কেবল সময় কাটায় না - বরং নিজেকে নির্মাণ করে। যে ব্যক্তি এই মাসকে অবহেলায় হারিয়ে ফেলে, সে যেন নিজের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সুযোগ হারিয়ে ফেলে। রোযা হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এক মহান উপহার। এটি শুধু একটি ফরজ ইবাদত নয় - এটি আত্মশুদ্ধির এক ঐশী পদ্ধতি, নফস দমনের এক পরম প্রশিক্ষণ এবং জান্নাত লাভের এক নিশ্চিত পথ।
অতএব আসুন, আমরা রমযানকে নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয় - বরং ঈমানের পুনর্জাগরণের মাস হিসেবে গ্রহণ করি। রোযাকে শুধু উপবাস নয়, বরং আত্মসংযম, তওবা, ইখলাস এবং তাকওয়ার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রমযানের রোযার প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করে যথাযথভাবে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক